ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৩ এপ্রিল ২০২৫

Ekushey Television Ltd.

স্বামী বিবেকানন্দ জ্ঞানের এক শান্ত বহমান নদী 

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

প্রকাশিত : ১২:০১, ২২ ডিসেম্বর ২০১৯ | আপডেট: ১৮:১৩, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯

স্বামী বিবেকানন্দ- সংগৃহীত

স্বামী বিবেকানন্দ- সংগৃহীত

Ekushey Television Ltd.

বর্তমানে একুশে টেলিভিশন’র নিজস্ব প্রতিবেদক। তিনি দৈনিক ইত্তেফাক, ডেইলি নিউএইজ, এনটিভি’র কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক ছিলেন ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি’র নেতৃত্ব দিয়েছেন। একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৭’তে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘আসমত আলীর অনশন’ প্রকাশিত হয়। তার বহু গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।

বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি একজন দার্শনিক ছাড়াও ছিলেন লেখক ও সঙ্গীতজ্ঞ মানুষও। তাঁর লেখা প্রত্যেকটা বই আজও সকল বাঙালী তথা সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীকে সমানভাবে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

দার্শনিক, ধর্মিয়-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠাতা। স্বামী বিবেকানন্দ এক অনন্য সাধারণ প্রতিভা, যিনি আধুনিক কালের ধর্ম-সংস্কৃতি এবং পরোক্ষভাবে ভারতীয়দের জাতীয় আত্মচেতনার রূপ দিতে সাহায্য করেছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হিন্দুধর্মীয় জীবনব্যবস্থা, আচরণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অভ্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি হিন্দুধর্মের বহু আদর্শিক বিচ্যুতির কড়া সমালোচক ছিলেন। তিনি একটি ভাবাদর্শ প্রচার এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন কর্মসূচি প্রদান করেছিলেন। তাঁর সময়ের তুলনায় বহু দিক থেকে প্রাগ্রসর চিন্তার অধিকারী বিবেকানন্দের জাতীয় পুনর্জীবনের পথ ও পন্থা নিয়ে বহু ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ রয়েছে।

জন্ম ও শৈশব:
বিবেকানন্দের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত (ডাকনাম ছিল বীরেশ্বর বা বিলে এবং নরেন্দ্র বা নরেন)। তিনি ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তি উৎসবের দিন উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে ৩ নম্বর গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিটে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা বিশ্বনাথ দত্ত কলকাতা উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবি ছিলেন। বিবেকানন্দ একটি প্রথাগত বাঙালি কায়স্থ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যেখানে তার নয় জন ভাই-বোন ছিল। তার মধ্যম ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও বিদেশ ভ্রমণে বিবেকানন্দের সঙ্গী। কনিষ্ঠ ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট সাম্যবাদী নেতা ও গ্রন্থকার।

এই দত্ত-পরিবারের আদি নিবাস ছিল অধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত দত্ত-ডেরিয়াটোনা বা দত্ত-ডেরেটোনা গ্রাম। মুঘল শাসনকাল থেকেই দত্তরা উক্ত গ্রামের অধিবাসী ছিলেন।

ছেলেবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার দিকে নরেন্দ্রনাথের আগ্রহ ফুটে ওঠে। এই সময় শিব, রাম, সীতা ও মহাবীর হনুমানের মূর্তির সামনে তিনি প্রায়শই ধ্যানে বসতেন। সাধু সন্ন্যাসীদের প্রতিও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। ছেলেবেলায় বিবেকানন্দ অত্যন্ত দুরন্ত ছিলেন। তার পিতামাতার পক্ষে তাকে সামলানো মাঝে মাঝেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠত। তার মা বলতেন, ‘শিবের কাছে ছেলে চাইলুম। তা তিনি নিজে না এসে পাঠালেন তার চেলা এক ভূতকে।’

শিক্ষা:
প্রথমে নিজ গৃহে মায়ের নিকট এবং পরে একজন গৃহশিক্ষকের নিকট নরেন্দ্রর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৮৭১ সালে নরেন্দ্রনাথ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। ১৮৭৭ এ তার পরিবার সাময়িকভাবে রায়পুরে (অধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ছত্তিসগড় রাজ্যে) স্থানান্তরিত হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে দত্ত পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। নরেন্দ্রনাথ প্রেসিডেন্সি কলেজের (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা) প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তিনিই ছিলেন সে বছর উক্ত পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ এক মাত্র ছাত্র। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। দর্শন, ধর্ম, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্য বিষয়ে বই পড়ায় তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। বেদ, উপনিষদ্‌, ভাগবদগীতা, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পাঠেও তার আগ্রহ ছিল। এছাড়া তিনি হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিতেন এবং নিয়মিত অনুশীলন, খেলাধুলো ও সমাজসেবামূলক কাজকর্মে অংশ নিতেন। 

জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশনে (অধুনা স্কটিশ চার্চ কলেজ, কলকাতা) পড়ার সময় নরেন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য যুক্তিবিদ্যা, পাশ্চাত্য দর্শন ও ইউরোপীয় ইতিহাস অধ্যয়ন করেছিলেন। ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চারুকলা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। নরেন্দ্রনাথ ডেভিড হিউম, জর্জ ডব্লিউ. এফ. হেগেল, আর্থার সোফেনহায়ার, ওগুস্ত কোঁত, জন স্টুয়ার্ট মিল ও চার্লস ডারউইনের রচনাবলি পাঠ করেছিলেন। হারবার্ট স্পেনসারের বিবর্তনবাদের প্রতি তিনি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সে সময়ে স্পেনসারের সঙ্গে তার চিঠিপত্র বিনিময়ও চলত। স্পেনসারের এডুকেশন (১৮৬১) বইটি তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। পাশ্চাত্য দার্শনিকদের রচনাবলি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ ও বাংলা সাহিত্য নিয়েও চর্চা করেন। জেনেরাল অ্যাসেম্বলি’জ ইনস্টিটিউশনের প্রিন্সিপাল উইলিয়াম হেস্টি লিখেছেন, ‘নরেন্দ্র সত্যিকারের মেধাবী। আমি বহু দেশ দেখেছি, কিন্তু তার মতো প্রতিভা ও সম্ভাবনাময় ছাত্র দেখিনি। এমনকি জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দর্শন ছাত্রদের মধ্যেও না।’

একজন যুব-সত্যানুসন্ধানকারী হিসেবে ঈশ্বর জ্ঞানলাভের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ জন্মলাভ করে। তিনি রাজা রামমোহন রায়ের বেদান্তবিষয়ক গ্রন্থাদি পাঠ করে ব্রাহ্মসমাজের প্রতি আকৃষ্ট হন। কেশবচন্দ্র সেন এ আন্দোলনের একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলে নরেন্দ্র তাঁর বক্তৃতা শুনতেন এবং তাঁর সংগঠিত সভা সমিতিতে ভক্তিমূলক সংগীত পরিবেশন করতেন।

আধ্যাত্মিক শিক্ষানবীশ - ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব
বাঙালি সমাজে খ্যাতনামা আধ্যাত্মিক পুরুষদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের জিজ্ঞাসা করতেন তাঁরা ‘ঈশ্বরকে দেখেছেন কিনা’। বলা হয়ে থাকে এ রকম প্রশ্নের উত্তরে বিখ্যাত মরমি সাধক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর  বলেছিলেন, তিনি অবশ্য ঈশ্বরকে দেখেননি, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস নরেন্দ্র অবশ্যই ঈশ্বরকে দেখার সাধনায় সার্থক হবেন। জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশনের অধ্যক্ষ রেভারেন্ড হেস্টি নরেন্দ্রকে রামকৃষ্ণ-এর কথা বলেন এবং তাঁকে আধ্যাত্মিক সাধনায় আবিষ্ট পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করেন। নরেন্দ্র যথারীতি তাঁকে এ প্রশ্ন  জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তাঁকে দেখেছি এবং তোমাকেও দেখাতে পারি।’ নানা প্রকার বাস্তবধর্মী প্রশ্ন ও তর্ক-বিতর্কের পর অল্প সময়ের মধ্যে নরেন্দ্র প্রথমে রামকৃষ্ণের ভক্ত এবং অচিরেই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

নরেনের জীবনে এমন একটি সময় আসে যখন তিনি পার্থিব জীবন এবং সন্ন্যাস জীবনের যে কোনো একটি গ্রহণ করার বিষয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এ সময় তিনি আইন বিষয়ে পড়াশুনা করছিলেন, কিন্তু পিতার মৃত্যুর কারণে তিনি পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তাঁকে তাঁর পরিবারের ভরণপোষণের দায়ভার গ্রহণ করতে হয় এবং তিনি মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে, তিনি কেশবচন্দ্র সেনের নব বিধানের সদস্য হয়েছিলেন, যা রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এবং খ্রিস্টান ধর্ম থেকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর সেন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ নরেন্দ্রনাথ ফ্রিম্যাসনারি লজের সদস্য হয়েছিলেন এবং তার কুড়ি বছর বয়সে কেশবচন্দ্র সেন ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজেরও সদস্য হন। ১৮৮১ থেকে ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সেনের ব্যান্ড অব হোপ-এ সক্রিয় ছিলেন, যা যুবসমাজকে ধূমপান এবং মদ্যপানে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিল।

নরেন্দ্র প্রাশ্চাত্য ধর্মবিশ্বাস এসোটিরিসিজমের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেছিলেন। তার প্রারম্ভিক ধর্মবিশ্বাস ব্রাহ্ম ধারণার আদলে গড়ে উঠেছিল। এই সময় তিনি নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী হন এবং পৌত্তলিকতার সমালোচকে পরিণত হন। এবং দৃঢ়ভাবে উপনিষদ ও বেদান্তের যৌক্তিকীকরণ, মসৃণ, একেশ্বরবাদী ধর্মতত্ত্ব নির্বাচনী ও আধুনিক পঠন নির্ধারণ করেছিলেন।

দর্শন সম্পর্কে তার জ্ঞানে সন্তুষ্ট না হয়ে নরেন্দ্রনাথ ভাবতে থাকেন, ঈশ্বর ও ধর্ম সত্যিই কি মানুষের ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতার অংশ। তিনি এই নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন। কলকাতার অনেক বিশিষ্ট অধিবাসীকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তারা ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করেছেন কিনা। কিন্তু কারোর উত্তরই তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

রামকৃষ্ণের সঙ্গে: 

নরেনের ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে তাঁর পিতার একটি পরিকল্পনা ছিল। তিনি ইংল্যান্ডে যাবেন এবং ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে এসে আইন ব্যবসা শুরু করবেন। কিন্তু অধ্যাত্ম-জীবনের প্রতি আকর্ষণই তাঁর নিকট বড় হয়ে দেখা দেয় এবং তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণের আশায় বাড়ি ত্যাগ করেন। 
১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে অথবা ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে দুজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নরেন্দ্রনাথ দক্ষিণেশ্বরে আসেন রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সঙ্গে সাক্ষাত করতে। এই সাক্ষাৎ নরেন্দ্রনাথের জীবনে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সাক্ষাতকারের প্রসঙ্গে নরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "তাহাকে (রামকৃষ্ণ দেব) একজন সাধারণ লোকের মতো বোধ হইল, কিছু অসাধারণত্ব দেখিলাম না।

শিষ্য কর্তৃক রচিত বিবেকানন্দের বহু জীবনী এবং স্মৃতিকথা রয়েছে। কিন্তু গুরুর নিকট থেকে তারা কী শিক্ষালাভ করেছেন—এ প্রশ্নের উত্তরে সকলেই নীরব থাকেন। মানবসেবা এবং বিশেষ করে পাশ্চাত্যে বেদান্ত ও যোগদর্শন প্রচারের জন্য যখন বিবেকানন্দ ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন, তখন তিনি বলেন তিনি যা কিছু করছেন তা গুরুর নির্দেশেই করছেন। কিন্তু তাঁর কর্মসূচি ও গুরুর শিক্ষার মধ্যে সুনির্দিষ্ট সম্পর্কের বিষয়টি সুস্পষ্ট নয়। তাঁর গুরু অধিকাংশ সময় দেবীর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন এবং তাঁকে দেবী মা-কালি হিসেবে ‘দেখেছিলেন’। তিনি আরও দাবি করেছিলেন যে, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মসহ সব প্রধান ধর্মের মরমি ভাবধারার মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরকে উপলদ্ধি করেছিলেন। বিবেকানন্দ তাঁর জীবন ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু তাঁর ধ্যান ধারণাগুলি  কখনো প্রচার করার চেষ্টা করেননি, বা রামকৃষ্ণের অনুলিখিত কোনো গ্রন্থে আমরা মানব সেবার বিশেষ করে অনগ্রসর শ্রেণির জনগণের  সেবার উল্লেখ পাই না। অথচ এ মানবসেবাই ছিল বিবেকানন্দের জীবনসাধনার মূলকথা।

১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর নরেন্দ্র ও তাঁর ১২ জন শিষ্য কলকাতার উপকণ্ঠ বরাহনগরে একটি ‘মঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তাঁরা গুরুর নিকট থেকে শিক্ষালদ্ধ আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। এশিয়াটিক সোসাইটি গ্রন্থাগার থেকে বই এনে তাঁরা সেখানে গভীরভাবে বৌদ্ধিকচর্চাও শুরু করেন। তাঁদের স্তবসংগীতের মধ্যে একটি কৌতুহলোদ্দীপক মন্ত্র হচ্ছে ‘প্রজাতন্ত্র দীর্ঘজীবী হউক’ (Vive la republique) যা তাঁদের এ পার্থিব জগতের রাজনৈতিক আদর্শের ইঙ্গিত প্রদান করে। বিবেকানন্দের নেতৃত্বে পরিচালিত আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে বেশ কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। বরাহনগর মঠে থাকাকালীন বিবেকানন্দ তাঁর সন্ন্যাসী নাম বিবেকানন্দ গ্রহণ করেন। পরে কোনো একসময়ে ববিশানন্দনামে আরেকটি নাম গ্রহণ করেন।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে কাশীপুরে বিবেকানন্দ- সংগৃহীত

বরাহনগরে রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা:
রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের মৃত্যুর পর তার ভক্ত ও অনুরাগীরা তার শিষ্যদের সাহায্য করা বন্ধ করে দেন। বাড়ি ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে না পারায়, নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য শিষ্যেরা বসবাসের জন্য নতুন বাসস্থানের খোঁজ শুরু করেন। অনেকে বাড়ি ফিরে গিয়ে গৃহস্থ জীবন যাপন করতে থাকেন। অবশিষ্ট শিষ্যদের নিয়ে নরেন্দ্রনাথ উত্তর কলকাতার বরাহনগর অঞ্চলে একটি ভাঙা বাড়িতে নতুন মঠ প্রতিষ্ঠা করার কথা চিন্তা করেন। বরাহনগর মঠের এই বাড়িটির ভাড়া কম ছিল। 

‘মাধুকরী’ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে এই বাড়িভাড়ার টাকা জোগাড় করা হত। বরাহনগর মঠ হল রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম ভবন। এই মঠে নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য শিষ্যেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যান করতেন এবং কঠোর ধর্মানুশীলন অভ্যাস করতেন। পরবর্তীকালে নরেন্দ্রনাথ বরাহনগর মঠের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, বরাহনগর মঠে আমরা অনেক তপস্যা করতাম। ভোর তিনটের সময় ঘুম থেকে উঠে আমরা জপ ও ধ্যানে মগ্ন হয়ে যেতাম। সেই সময় কী তীব্র বৈরাগ্য জন্মেছিল আমাদের মনে! জগৎ আছে কি নেই সে কথা আমরা ভাবতামও না।

১৮৮৭ সালে নরেন্দ্রনাথ বৈষ্ণব চরণ বসাকের সঙ্গে সঙ্গীতকল্পতরু নামে একটি সঙ্গীত-সংকলন সম্পাদনা করেন। নরেন্দ্রনাথ-ই এই বইটির অধিকাংশ গান সংকলন ও সম্পাদনা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য তিনি বইটির কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। 

সন্ন্যাস গ্রহণ:
১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে, নরেন্দ্রনাথের গুরুভ্রাতা বাবুরামের মা নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য সন্ন্যাসীদের আঁটপুর গ্রামে আমন্ত্রণ জানান। তারা সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করে হুগলি জেলার আঁটপুরে যান এবং কিছুদিন সেখানে থাকেন। আঁটপুরেই বড়দিনের পূর্বসন্ধ্যায় নরেন্দ্রনাথ ও আটজন শিষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তারা রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের মতো করে জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেন। নরেন্দ্রনাথ ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ নাম গ্রহণ করেন। 

বরাহনগর মঠে কিছুকাল ‘সাধনার’ অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অনুশীলনের পর শিষ্যগণ সন্ন্যাসীদের নিয়ে আরেকটি কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আলোকিত হওয়ার জন্য তাঁরা সকলে পরিব্রাজক অর্থাৎ কপর্দকহীন পর্যটক হিসেবে বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ শুরু করেন। এ নতুন কর্মসূচিতে বিবেকানন্দ কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। এ সময় তিনি জয়পুরের রাজপন্ডিতদের নিকট পাণিণির ব্যাকরণ, ক্ষেত্রবীর মহারাজার রাজপন্ডিত নারায়ণ দাসের নিকট পতঞ্জলির মহাভাষ্য এবং পোরবন্দের পান্ডুরাঙ্গের নিকট বেদান্ত পাঠ করেন। 

এ ভ্রমণ শেষে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ শিষ্য তুরীয়ানন্দ তাঁকে ঈশ্বর উপলদ্ধি করেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করেন। তিনি এর নেতিবাচক উত্তর দিয়ে বলেন তিনি একটি মাত্র জিনিস শিখেছেনলল— মানুষকে ভালোবাসা। তিনি আরও একটি বিষয় শিক্ষালাভ করেছেনল-ক্ষুধা। 

১৯০০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ পাসাদেনায় মিড সিস্টার্স হাউসে বিবেকানন্দ -সংগৃহীত

পরিব্রাজক বিবেকানন্দ:
১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বারাণসী থেকে তার যাত্রা শুরু করেন। বারাণসীতে তার সঙ্গে সাক্ষাত হয় বিশিষ্ট বাঙালি লেখক ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বিশিষ্ট সন্ত ত্রৈলঙ্গস্বামীর। এইখানেই বিশিষ্ট সংস্কৃত পণ্ডিত বাবু প্রেমদাস মিত্রের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে, যাঁর সঙ্গে পরবর্তীকালে একাধিক পত্রালাপে তিনি হিন্দু ধর্মশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। 

হিমালয় ভ্রমণ:
১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে গুরুভ্রাতা স্বামী অখণ্ডানন্দের সঙ্গে তিনি পুনরায় পরিব্রাজক সন্ন্যাসীরূপে দেশভ্রমণে বের হন। মঠে ফেরেন একেবারে পাশ্চাত্য ভ্রমণ সেরে। প্রথমে তিনি যান নৈনিতাল, আলমোড়া, শ্রীনগর, দেরাদুন, ঋষিকেশ, হরিদ্বার এবং হিমালয়ে। কথিত আছে, এই সময় এক দিব্যদর্শনে তিনি বহির্জগৎ ও ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন। 

রাজপুতানা:
দিল্লির ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেখার পর তিনি চলে যান রাজপুতানার ঐতিহাসিক রাজ্য আলোয়ারে। পরে তিনি যান জয়পুরে। সেখানে এক সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে অধ্যয়ন করেন পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী। তার পরের গন্তব্য ছিল আজমীর। সেখানকার বিখ্যাত দরগা ও আকবরের প্রাসাদ দেখে তিনি চলে যান মাউন্ট আবুতে। মাউন্ট আবুতে তার সঙ্গে সাক্ষাত হয় খেতরির মহারাজা অজিত সিংহের। পরে তিনি বিবেকানন্দের একনিষ্ঠ ভক্ত ও পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। 

পশ্চিম ভারত:
পশ্চিমে যাত্রাপথে তিনি ভ্রমণ করেন আহমেদাবাদ (বর্তমান গান্ধিনগর), ওয়াধওন ও লিম্বদি। আহমেদাবাদে তিনি ইসলামি ও জৈন সংস্কৃতির পাঠ সমাপ্ত করেন। লিম্বদিতে ঠাকোর সাহেব জসওয়ান্ত সিংহের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়, যিনি নিজে আমেরিকা ও ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেছিলেন। 

এরপর তিনি যান মহাবালেশ্বর এবং তারপর যান পুণায়। পুণা থেকে ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাস নাগাদ তিনি খান্ডোয়া ও ইন্দোর ভ্রমণ করেন। কাথিয়াওয়াড়ে তিনি বিশ্বধর্ম মহাসভার কথা শোনেন। 

দক্ষিণ ভারত:
বেঙ্গালুরুতে স্বামীজি মহীশূর রাজ্যের দেওয়ান স্যার কে শেষাদ্রি আইয়ারের সঙ্গে পরিচিত হন এবং পরে তিনি মহীশূরের মহারাজা শ্রী চামারাজেন্দ্র ওয়াদিয়ারের অতিথি হিসেবে রাজপ্রাসাদে অবস্থান করেন। বিবরণ অনুসারে স্যার শেষাদ্রী স্বামীজির পান্ডিত্য বিষয়ে মন্তব্য করেন, ‘এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ঐশ্বরিক শক্তি যা তার দেশের ইতিহাসে তাদের চিহ্ন রেখে যেতে নিয়তি নির্ধারিত ছিল।’ 

বেঙ্গালুরু থেকে তিনি ভ্রমণ করেন ত্রিচুড়, কোদুনগ্যালোর, এর্নাকুলাম। এর্নাকুলামে ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরের প্রথমভাগে তিনি নারায়ণ গুরুর সমসাময়িক ছত্তাম্পি স্বামীকালের দেখা পান। এর্নাকুলাম থেকে তিনি ভ্রমণ করেন ত্রিবান্দ্রম, নাগেরকৈল এবং ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের বড়োদিনের প্রাক্কালে পায়ে হেঁটে কন্যাকুমারী পৌঁছান। 

জাপান ভ্রমণ:
তার শিকাগো যাবার পথে বিবেকানন্দ ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে জাপান ভ্রমণ করেন। প্রথমে তিনি বন্দর নগরী নাগাসাকি পৌঁছান এবং তারপর কোবে যাবার জন্য একটি স্টীমারে চড়েন। এখান থেকে তিনি স্থলপথে তিন বড়ো শহর ওসাকা, কিয়োটো এবং টোকিও ভ্রমণ করে ইয়োকোহামা যান। তিনি জাপানীদের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জনগণের অন্যতম’ বলে অভিহিত করেন এবং শুধুমাত্র তাদের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরের পরিচ্ছন্নতার দ্বারাই চমৎকৃত হননি বরং তাদের কর্মচাঞ্চল্য, মনোভাব ও ভঙ্গি দেখেও চমৎকৃত হন। যাদের সকল কিছু্কেই তার মনে হয়েছিল ‘চিত্রবৎ বা ছবির মতো’

১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে এক ধর্মসভায় বীরচাঁদ গান্ধি, ধর্মপাল, স্বামী বিবেকানন্দ, নিকোলা টেসলা (বাম থেকে ডানে)- সংগৃহীত

 

বিশ্বধর্ম মহাসভা:
প্রথম বিশ্বধর্ম মহাসভা ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে উদ্বোধন হয়। এদিন বিবেকানন্দ তার প্রথম সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি ভারত এবং হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। 

আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বক্তৃতাদান:
ধর্মসভা শেষ হওয়ার পর বিবেকানন্দ যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন স্থানে অতিথি হিসেবে ভ্রমণ করেন। তার জনপ্রিয়তা ‘সহস্র জীবন ও ধর্মের’ উপর নতুন অভিমতের দ্বার উন্মোচন করে। ব্রুকলিন এথিক্যাল সোসাইটির একটি প্রশ্ন-উত্তর পর্বের সময়, তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘প্রাশ্চাত্যের প্রতি আমার একটি বার্তা রয়েছে, যেমনটা বুদ্ধের ছিল প্রাচ্যের প্রতি।’

শিকাগো আর্ট ইনস্টিটিউটে ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে ধর্মসভা শেষ হওয়ার পর বিবেকানন্দ পুরো দু-বছর পূর্ব ও কেন্দ্রীয় যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে শিকাগো, ডেট্রয়েট, বোস্টন এবং নিউইয়র্কে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিউইয়র্কে বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।

আমেরিকায় তার প্রথম পরিদর্শনের সময় ১৮৯৫ ও ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দু-বার ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন এবং সেখানে তার বক্তৃতাসমূহ সফল ছিল। 

ভারতে প্রত্যাবর্তন:
বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি কলম্বো পৌঁছান এবং এক পরমানন্দদায়ক অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন। এখানে তিনি প্রাচ্যে তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তৃতা (ভারত, পবিত্র ভূমি) করেন। সেখান থেকে কলকাতায় তার পৌঁছানো ছিল এক বিজয়ঘটিত প্রত্যাবর্তন। তিনি ভ্রমণ করেন কলম্বো থেকে পাম্বান, রামেস্বরম, রামনাদ, মাদুরাই, কুম্বাকোনাম এবং মাদ্রাজ। এই জায়গাগুলোতে তিনি বক্তৃতা দেন। জনগণ এবং রাজারা তাকে অত্যুৎসাহী অভ্যর্থনা জানান। 

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা:

অদ্বৈত আশ্রম, মায়াবতী, রামকৃষ্ণ মঠের একটি শাখা, প্রতিষ্ঠাকাল মার্চ ১৯, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ, পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দের অনেক লেখা প্রকাশ করে, বর্তমানে "প্রবুদ্ধ ভারত" সাময়িকী প্রকাশ করে
১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে কলকাতায় বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠা করেন ধর্ম প্রচারের জন্য সংগঠন ‘রামকৃষ্ণ মঠ’ এবং সামাজিক কাজের জন্য সংগঠন ‘রামকৃষ্ণ মিশন’। এটি ছিল শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক, চিকিৎসা-সংক্রান্ত এবং দাতব্য কাজের মধ্য দিয়ে জনগণকে সাহায্য করার এক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলনের প্রারম্ভ।

দ্বিতীয় পাশ্চাত্য ভ্রমণ:
স্বামীজি ভগ্ন স্বাস্থ্য সত্ত্বেও পুনরায় ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।[১৪৭] তার সঙ্গী ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা এবং স্বামী তুরিয়ানন্দ। তিনি স্বল্প সময় ইংল্যান্ডে অবস্থান করার পর যুক্তরাষ্টে যান। তার এই ভ্রমণকালে তিনি সানফ্রান্সিসকো ও নিউইয়র্কে বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। ঙ্কুচিত করে তোলে।

বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ মন্দির, এখানে তাকে অন্তিম সংস্কার করা হয়- সংগৃহীত


শেষ জীবন:
৪ জুলাই ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ, বিবেকানন্দ ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন, বেলুড় মঠের চ্যাপেলে তিন ঘন্টা ধরে ধ্যান করেন। এরপর তিনি ছাত্রদের শুক্লা-যজুর্বেদ শেখান যা একটি সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং যোগ দর্শন। পরে সহকর্মীদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ মঠের বৈদিক কলেজে একটি পরিকল্পনার আলোচনা করেন। তিনি ভ্রাতা-শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দের সঙ্গে হাঁটেন এবং তাকে রামকৃষ্ণ মঠের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও নির্দেশনা দেন। সন্ধ্যায় বিবেকানন্দ তার ঘরে ফেরেন এবং তাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করেন। এর প্রায় দুই ঘন্টা পর রাত নয়টার দিকে ধ্যানরত অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন। তার শিষ্যদের মতে, বিবেকানন্দের মহাসমাধি ঘটেছিল। আর চিকিৎসকের প্রতিবেদনে বলা হয় এটি হয়েছে তার মস্তিষ্কে একটি রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে, কিন্তু তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ধার করতে পারেননি।

স্বামী বিবেকানন্দ-এর এমন কিছু বাণী:
নেতিবাচক ভাবনা ঘিরে ধরলে যে পথ মানতে হবে... স্বামীজি বলেছেন, শক্তি ও সাহসিকতাই ধর্ম। দুর্বলতা ও কাপুরুষতাই পাপ। অপরকে ভালোবাসাই ধর্ম, অপরকে ঘৃণা করাই পাপ । ফলে সুস্থ জীবনে বাঁচতে এই রাস্তাই একান্ত কাম্য।

ধর্ম সম্পর্কে ধারণা:
ধর্ম ও কুসংস্কার নিয়ে স্বামীজির একটি অমর বাণী হল, 'দর্শনবর্জিত ধর্ম কুসংস্কারে গিয়ে দাঁড়ায়, আবার ধর্মবর্জিত দর্শন শুধু নাস্তিকতায় পরিণত হয়। আমাদের নিম্নশ্রেণীর জন্য কর্তব্য এই, কেবল তাহাদিগকে শিক্ষা দেওয়া এবং তাহাদের বিনষ্টপ্রায় ব্যক্তিত্ববোধ জাগাইয়া তোলা।' 

জীবনধারা কেমন হবে? 
স্বামীজীর মক অমর বাণী হল, 'অসংযত ও উচ্ছৃঙ্খল মন আামাদের নিয়ত নিম্ন থেকে নিম্নতর স্তরে নিয়ে যাবে এবং চরমে আমাদের বিধ্বস্ত করবে, ধ্বংস করবে। আর সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত মন আমাদের রক্ষা করবে, মুক্তিদান করবে।' 

সাফল্যের পথ কেমন হবে?
সাফল্য অর্জন করা নিয়ে স্বামীজির বাণী, 'সাফল্য লাভ করিতে হইলে প্রবল অধ্যবসায়, প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি থাকা চাই। অধ্যবসায়শীল সাধক বলেন,' আমি গণ্ডূষে সমুদ্র পান করিব। আমার ইচ্ছামাত্র পর্বত চূর্ণ হইয়া যাইবে।' এইরূপ তেজ, এইরূপ সংকল্প আশ্রয় করিয়া খুব দৃঢ়ভাবে সাধন কর। নিশ্চয়ই লক্ষে উপনীত হইবে।'

হতাশা গ্রাস করলে কী করা উচিত?
বিপদে মানুষ পড়তেই পারেন। তবে সেখান থেকে নিজেকে তুলে ধরতে রাস্তা দেখিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি বলছেন, 'নিজেদের বিপদ থেকে টেনে তোলো! তোমার উদ্ধার-সাধন তোমাকেই করতে হবে।...ভীত হয়ো না। বারবার বিফল হয়েছো বলো নিরাশ হয়ো না। কাল সীমাহীন, অগ্রসর হতে থাকো, বারবার তোমার শক্তি প্রকাশ করতে থাকো, আলোক আসবেই।' 

অনুপ্রেরণা দেয় যে বাণী

স্বামীজি বলেছেন, 'হে বীরহৃদয় যুবকগণ ,তোমরা বিশ্বাস কর যে ,তোমরা বড় বড় কাজ করবার জন্য জন্মেছ। ওঠ, জাগো, আর ঘুমিও না; সকল অভাব, সকল দুঃখ ঘুচাবার শক্তি তোমাদের ভিতরেই আছে। এ কথা বিশ্বাস করো, তা হলেই ঐ শক্তি জেগে উঠবে।' 

কাজ ও জীবনবোধ 
স্বামীজি বলেছেন, 'তোমরা কাজ করে চল। দেশবাসীর জন্য কিছু কর-তাহলে তারাও তোমাদের সাহায্য করবে, সমগ্র জাতি তোমার পিছনে থাকবে। সাহসী হও, সাহসী হও! মানুষ একবারই মরে। আমার শিষ্যেরা যেন কখনো কোনমতে কাপুরুষ না হয়।' 

জগতকে কীভাবে পরিবর্তন করা যাবে? 
স্বামীজি বলছেন, 'কেবল শারীরিক সাহায্য দ্বারা জগতের দুঃখ দূর করা যায় না। যতদিন না মানুষের প্রকৃতি পরিবর্তিত হইতেছে, ততদিন এই শারীরিক অভাবগুলি সর্বদাই আসিবে এবং দুঃখ অনুভূত হইবেই হইবে। যতই শারীরিক সাহায্য কর না কেন, কোনমতেই দুঃখ একেবারে দূর হইবে না। জগতের এই দুঃখ-সমস্যার একমাত্র সমাধান মানবজাতিকে শুদ্ধ ও পবিত্র করা। আমরা জগতে যাহা কিছু দুঃখকষ্ট ও অশুভ দেখিতে পাই, সবই অজ্ঞান বা অবিদ্যা হইতে প্রসূত। মানুষকে জ্ঞানালোক দাও, সকল মানুষ পবিত্র আধ্যাত্মিক-বলসম্পন্ন ও শিক্ষিত হউক, কেবল তখনই জগৎ হইতে দুঃখ নিবৃত্ত হইবে, তাহার পূর্বে নয়। দেশে প্রত্যেকটি গৃহকে আমরা দাতব্য আশ্রমে পরিণত করিতে পারি, হাসপাতালে দেশ ছাইয়া ফেলিতে পারি, কিন্তু যতদিন না মানুষের স্বভাব বদলাইতেছে, ততদিন দুঃখ-কষ্ট থাকিবেই থাকিবে।' 

জীবনবোধে কীভাবে অনুপ্রাণিত হওয়া যাবে?
স্বামীজী এই বিষয়ে একবার বলেন, 'চরিত্র গঠনের জন্য ধীর ও অবিচলিত যত্ন, এবং সত্যোপব্ধির জন্য তীব্র প্রচেষ্টাই কেবল মানব জাতির ভবিষৎ জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করিতে পারে।' সুখ কীভাবে মিলবে ? স্বামীজি সুখের বিষয়ে এক অসামান্য কথা বলেন। সুখ দর্শন যদিও সহ নয়, তবুও স্বামীজির এই বাণীটি 'ধ্রুবসত্য' হয়ে রয়েছে। তিনি বলেনেছেন, 'আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুখকর মুহুর্ত সেইগুলি, যখন আমরা নিজেদের একেবারে ভুলে যাই।'

আরও কিছু তথ্য-
১৮৮৭ সালে একবার বারাণসীর রাস্তায় স্বামী প্রেমানন্দকে নিয়ে ঘুরছেন স্বামীজি। সেইসময়ে কিছু বাঁদরের তাড়া খান। স্বামীজি দৌড়তে শুরু করলে একজন চেঁচিয়ে তাঁদের দাঁড় করান। বিবেকানন্দ ঘুরে দাঁড়ালে বাঁদরের দলও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই ঘটনা নিয়ে পরে ব্যাখ্যা করে স্বামীজি বলেছিলেন, সমস্যা হলে তার মুখোমুখি হতে হবে। তা থেকে পালিয়ে গেলে তার সমাধান হবে না। সাহসী চিত্তে সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে।

আগ্রা থেকে বৃন্দাবন যাওয়ার পথে ১৮৮৮ সালে রাস্তার ধারে একজনকে গাঁজা খেতে দেখে স্বামীজিও রাস্তায় বসে পড়েন। গাঁজার ছিলিম চাইলে সেই ব্যক্তি বলেন, আপনি সন্ন্যাসী। আমি নীচু জাতের লোক। আমি আপনাকে ছিলিম দিই কি করে? উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে গিয়েও স্বামীজি বসে পড়ে জোর করে গাঁজা খান। পরে জানিয়েছিলেন, কাউকে ঘৃণা করতে নেই। আমরা সবাই ঈশ্বরের সন্তান।

চেন্নাইতে স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৯৭)- সংগৃহীত
 

একবার স্বামীজি ঠিক করেন সকলের থেকে তিনি খাবার চেয়ে খান, এবার থেকে তা বন্ধ। লোকে এসে তাকে সাধ করে খেতে দিক। সেই না বলা, সেদিন থেকেই স্বামীজি খাবার চাইছেন না। দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। খিদেয় ছটফট করছেন তিনি। হঠাৎ একজন পিছন থেকে ডাক দিলেন মহারাজ বলে। স্বামীজি না দেখেই সামনে ছুট লাগালেন। সেই ব্যক্তিও ছুটে চলেছেন। কিছুটা যাওয়ার পরে তিনি বললেন, মহারাজ, দয়া করে খাবার গ্রহণ করুন। চোখ ভিজে এল স্বামীজির। তিনি বুঝলেন ঈশ্বর তাঁর সহায় রয়েছেন।

হরিদ্বার যাওয়ার পথে শরত চন্দ্র গুপ্ত নামে এক অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে দেখা হয়। স্বামীজির বড় চোখ দেখেই শরত বুঝতে পারেন ইনি কোনও সামান্য ব্যক্তি নন। বিবেকানন্দকে সঙ্গে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন শরত। শেষপর্যন্ত নাছোড় শরতকে দীক্ষা দিয়ে স্বামী সদানন্দ নাম দেন স্বামীজি। সদানন্দ বলতেন, বিবেকানন্দের চেয়ে বড় গুরু কেউ হয় না। আমি তাঁর সারমেয়।

১৮৯০ সালে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে গিয়ে বিবেকানন্দ জানতে পারেন পোহারি বাবা সম্পর্কে। তিনি সেখানেই থাকতেন। যৎসামান্য খেতেন। তাঁকে মহাপুরুষ বলে মনে হয় স্বামীজির। তিনি চিঠি লেখেন প্রেমদাদাস মিত্রকে। জানান, তিনি পোহারি বাবার দীক্ষা নেবেন। তবে দীক্ষা নেওয়ার আগের রাতে শ্রীরামকৃষ্ণ দুঃখ ভরা মুখে স্বপ্নে দেখা দেন। এরপরে পরপর ২১ দিন স্বামীজির স্বপ্নে একইরকম দুঃখ ভরা মুখে দেখা দেন স্বামীজি। ব্যস তারপরে দীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেন স্বামীজি।

স্বামী অভেদানন্দের অসুস্থতার খবর শুনে স্বামীজি গাজিপুর থেকে বারাণসী ছুটে যান। পথে যেতে যেতেই জানতে পারেন শ্রীরামকৃষ্ণের পরম সেবক বলরাম বসু প্রয়াত হয়েছেন। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে স্বামীজির গালে। তা দেখে প্রেমদাদাস মিত্র বলেন, সন্ন্যাসীর কাঁদতে নেই। যা শুনে স্বামীজি রেগে গিয়ে বলেন, আমি এমন সন্ন্যাস মানি না যেখানে হৃদয় পাথরের মতো করে ফেলতে হবে।

মেরঠে থাকাকালীন স্বামীজি লাইব্রেরি থেকে বই আনাতেন। স্বামী অভেদানন্দ বইগুলি নিয়ে আসতেন। আবার পরের দিনই পড়ে তা ফেরত দিয়ে দিতেন স্বামীজি। একদিন লাইব্রেরিয়ানের সন্দেহ হয়। একদিনে কীভাবে বই পড়া সম্ভব। স্বামীজি লাইব্রেরিতে আসতেই, সেই বই থেকে জিজ্ঞাসা করলেন লাইব্রেরিয়ান। স্বামীজি শুধু উত্তর দিলেন না, কোন পাতায় কী লেখা রয়েছে প্রায় সবই বলে দিলেন। যা দেখেন বাকরুদ্ধ হয়ে যান লাইব্রেরিয়ান।

সারা পৃথিবীতে জ্ঞানের বিতরণ করে বেড়ানো স্বামী বিবেকানন্দ পুঁথিগত শিক্ষায় তেমন মেধাবী ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তিনি ৪৭ শতাংশ নম্বর পান। এফএ পরীক্ষায় ৪৬ শতাংশ নম্বর ও বিএ পাশ করেন ৫৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে।

বিবেকানন্দের পিতা বিশ্বনাথ দত্তের প্রয়াণের পর পরিবারের অবস্থা বেশ খারাপ হয়। খাবার জোটানো তখন দায় ছিল। স্বামীজি প্রায় প্রতিদিনই বলতেন, আজ দুপুরে বাইরে নিমন্ত্রণ রয়েছে। এই বলে বেরিয়ে যেতেন যাতে বাড়ির খাবারের ভাগ বাকীরা বেশি পায়। নিজে প্রায় বেশিরভাগ দিনই অভুক্ত থাকতেন। তা নিয়ে গর্বও করতেন। (সংকলিত)

এমএস/ 
 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৫ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি